মুফতি মোহেববুল্লাহর অলীক অপহরণ

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে জনপরিসর যখন সরগরম, তখন নতুন মাত্রা যোগ করেছে মুফতি মোহেববুল্লাহ মিয়াজীর ‘অপহরণ’ ঘটনা। প্রথমে সংবাদমাধ্যমের বরাতে আমরা জানতে পেরেছিলাম, বুধবার সকালে হাঁটতে বের হয়ে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে নিখোঁজ হন তিনি। সেখানকার টিঅ্যান্ডটি এলাকার বিটিসিএল জামে মসজিদে তিনি পেশ ইমাম ও খতিব হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন; থাকতেনও সেখানকার কলোনি মসজিদের কোয়ার্টারে। পরদিন সকালে পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের সিতাগ্রাম হেলিপ্যাড এলাকায় এক মহাসড়কের পাশ থেকে শিকল বাঁধা অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়।ওইদিন রাতেই পরিবারের সদস্যরা পঞ্চগড় গিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনেন। আমাদের দেশে অপহরণের অঘটন নতুন নয়। অপহরণ ঘিরে নাটকীয়তাও বিরল নয়। কিন্তু মুফতি মোহেববুল্লাহর অপহরণকাণ্ড আগের সব ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে।

পঞ্চগড় থেকে ‘উদ্ধার’ হয়ে গাজীপুর আসার এক দিন পর গত শুক্রবার টঙ্গী পূর্ব থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন মোহেববুল্লাহ। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন হাঁটতে বের হলে অ্যাক্সস লিংক ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে চার-পাঁচজন ব্যক্তি তাঁকে ধরে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে ওঠায় এবং কালো কাপড়ে চোখ-মুখ বেঁধে নির্যাতন চালায়। এভাবে প্রায় সারাদিন গাড়িটি বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে। তারপর তাঁকে মারধর করে বিবস্ত্র অবস্থায় অজ্ঞাত স্থানে গাড়ি থেকে নামিয়ে গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে যায়।

আরও পড়ুনঃ ব্যারিকেড সরলেও রয়েছে পুলিশ, কাকরাইল ফিরেছে পুরোনো রূপে
ঘটনাটি নিয়ে তদন্তে নেমে পুলিশ মোহেববুল্লাহর নিখোঁজ হওয়া এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে। চার-পাঁচ দিন ধরে তদন্ত, ফুটেজ বিশ্লেষণ ও জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মঙ্গলবার গাজীপুর মহানগর পুলিশ জানায়, মোহেববুল্লাহ মিয়াজীকে অপহরণের ঘটনা সত্য নয়। মূলত তিনি নিজেই গা-ঢাকা দিয়েছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, মোহেববুল্লাহর বাসা থেকে কথিত অপহরণস্থল পর্যন্ত বিভিন্ন সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে দেখা যায়, তিনি বাসা থেকে বের হয়ে একা হেঁটে নিমতলী সিএনজি পাম্প পার হয়ে পূবাইল থানার মাজুখান হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। এজাহারে ৪-৫ ব্যক্তি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও তিন ঘণ্টার মধ্যে সেখানে কোনো অ্যাম্বুলেন্স চলাচল করতে দেখা যায়নি। এ ছাড়া মোহেববুল্লাহ শ্যামলী কাউন্টার থেকে দুপুর ২টার সময় পঞ্চগড়গামী বাসের টিকিট কেটে বাসে চড়েন। যাত্রাপথে বগুড়ার শেরপুর থানার পেন্টাগন হোটেলে যাত্রাবিরতির সময় তিনি বাস থেকে নেমে নামাজ আদায় করেন।

পুলিশের সংবাদ সম্মেলনের পর মোহেববুল্লাহর পরিবার থেকে স্বীকার করা হয়– তিনি নিজ ইচ্ছাতেই এসব করেছেন। আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা যায়। মোহেববুল্লাহ নিজেও ফোনে বলেন, ‘আমি নিজেই সব করেছি। নিজের পরিকল্পনায় পঞ্চগড়ে গিয়েছি, গুম হওয়ার অভিনয় করেছি এবং ঘটনাটি ভাইরাল করেছি। তাই আর বাড়াবাড়ি করার প্রয়োজন নেই।’

মোহেববুল্লাহ কেন এ ঘটনা ঘটালেন– কোনো ব্যাখ্যা নেই। ফলে স্বাভাবিকভাবে জনমনে বিভ্রান্তি কাটেনি, বরং বেড়েছে। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমে লিখছেন, হয়তো জিনেরা তাঁকে ‘অপহরণ’ করে ভিনগ্রহে নিয়ে গিয়েছিলেন, পরে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে দিয়েছে!
ঘটনাটিকে নিছক মানসিক সমস্যা বা পারিবারিক সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মোহেববুল্লাহর ‘স্বীকারোক্তি’ কতটা তাঁর নিজের কিংবা কতটা পুলিশের– তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেও শেষ করা যাবে না। কারণ এই অপহরণকাণ্ডের অত্যন্ত স্পর্শকাতর দিকও রয়েছে।
দেখা যাচ্ছে, বৃহস্পতিবার সকালে মোহেববুল্লাহ পঞ্চগড় থেকে উদ্ধার হওয়ার পর দুপুরেই জেলা শহরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংগঠন আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করে পঞ্চগড় ইমান আকিদা রক্ষা কমিটি। অন্যদিকে মোহেববুল্লাহর ‘স্বরচিত অপহরণকাণ্ড’ স্পষ্ট হওয়ার পর বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সংগঠন ও সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে হুমকি ও অপপ্রচারে উদ্বেগ ও নিন্দা জানানো হয়।

মন্দের ভালো, মোহেববুল্লাহ নিজেই অপহরণকাণ্ড স্বীকার করেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও সংবাদ সম্মেলনও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে মোড় নিতেও পারত।
আমরা দেখছি, সামাজিক মাধ্যম সম্প্রসারিত হওয়ার পর এবং বিশেষভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের পর গুজব ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা সহজ। কিন্তু গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে বা বিভ্রান্তি তৈরিতে এখনও মানব-মস্তিষ্ক যে সেরা– মুফতি মোহেববুল্লাহর ঘটনার পর আরেকবার প্রমাণ হলো

Check Also

যুক্তরাষ্ট্রের পর এবার ভারতের ওপর শুল্ক বসানোর পথে বাংলাদেশ

গত সোমবার (৫ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ভারত থেকে তুলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *